প্রথম দেখা দার্জিলিং

Blog | Dec 17 | 2020 | No Comment

নিম্ন হিমালয়ের মহাভারত শৈলশ্রেণীতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭,১০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে অপূর্ব একটি শহর, দার্জিলিং। এপার বাংলা কিংবা ওপার বাংলা যাই হোক না কেন, বাঙ্গালী মানেই, দার্জিলিং এর অনেক গল্প মনের কোনে সাজানো থাকে। হয়তো গল্প- উপন্যাস- নাটক- সিনেমা কিংবা অঞ্জন দত্ত। এবারের গল্প হিমালয়ের শিবালিক পর্বতশ্রেনীতে অবস্থিত  ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলের শহর দার্জিলিং।

আমার প্রথম দেখা দার্জিলিং ভাগ্যক্রমে  অদ্ভূত  একটা সময়ে। ২০১৭ সাল,  তখন দার্জিলিং জুড়ে গোর্খাল্যান্ড এর আন্দোলন চলছিলো৷ দার্জিলিং এ তখন থমথমে পরিস্থিতি, এই দ্বন্দটা অনেকটাই গোর্খা বাংগালি দ্বন্দ্বতে রূপ নিয়েছে। আমি বাংলাদেশি হলেও বাংগালি তো, তাই মনের কোনে শংকা ও দ্বিধা থেকেই যায়। তবুও দার্জিলিং এর কিছু গোর্খা বন্ধুর আমন্ত্রণ সেই উত্তপ্ত সময়ে আমাকে প্রথমবারের মতো দার্জিলিং টেনে এনেছিলো।। তখনকার সাম্প্রতিক সময়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারনে দার্জিলিং এর বেশিরভাগ হোটেল মোটেল ছিল বন্ধ। অল্প কিছু স্থানীয় কর্মচারীদের হাতে দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে বেশিরভাগ মালিক দার্জিলিং ছেড়ে চলে গিয়েছে। এমন একটি হোটেল দার্জিলিং এর বন্ধুরাই ম্যানেজ করে ফেললো। তবে এইটুকু বলা যায় আমার দীর্ঘ ভ্রমন জীবনে, সবচেয়ে দ্রুত যদি কোনো শহরের প্রেমে পড়ে থাকি সেটি হলো দার্জিলিং।

হোটেলে উঠেই , পর্দা সরিয়ে স্বচ্ছ কাচের জানালা দিয়ে পাহাড়ের বুকের এই শহরটাকে যখন দেখলাম, এক মুহুর্তেই শহরের থমথমে অবস্থার কথা  ভুলে গিয়েছিলাম। চমৎকার একটি হোটেল, একপাশের দেয়ালের প্রায় পুরোটাই স্বচ্ছ খোলা জানালা, বিছানায় শুয়েও পুরো শহরটাই দেখা যায় জানালা দিয়ে। একটু পর পর মেঘে ঢেকে যায় পাহাড়ের ভাজে ভাজে দাঁড়িয়ে থাকা সব বিল্ডিং, দূরের পুরো পাহাড়ের সারিটা, আবার মেঘ কাটিয়ে স্পষ্ট হয়ে জেগে উঠে পুরো শহরটা। রাতে জানালার পর্দা সরিয়ে ঘুমালেও শহরের নিয়ন আলোয় মেঘে ঢেকে যায় পুরো শহর, কি অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে ঘুমানো যায়, ভাবা যায়? দার্জিলিং এর বেশিরভাগ হোটেল মোটেল লিজের উপর চলে, মালিক পরিবর্তন হয়, তবুও প্রথমবারের মুগ্ধতা থেকেই কিনা জানি না, আমাদের পরবর্তী সময়ে সুমন্স ট্যুরিজমের বানিজ্যিক ট্যুরগুলোর বেশিরভাগ ট্যুরেই  এই  হোটেলটাকেই প্রাধান্য দিয়েছি,  সবার আগে।

দার্জিলিং, নামের হিমালয়ের কোলের এই  শহরটাকে পৃথিবীর নানা মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছে। অঞ্জন দত্তের দার্জিলিং,ফেলুদার দার্জিলিং, বিভিন্ন  লেখকের চোখে দার্জিলিং, সাধারণ ট্যুরিস্টদের চোখে দার্জিলিং, বিদেশি ট্যুরিস্টদের চোখে দার্জিলিং, এক দার্জিলিং কে কত ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র, কত প্রকার ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছে, অনুভব করেছে, ভাবা যায়? কিন্তু আমার প্রথম দার্জিলিং দেখাটা বলা যায় আমার কিছু গোর্খা বন্ধুদের চোখেই।

গোর্খা বন্ধুদের পরিবারের বেশিরভাগের জীবিকা চা বাগান কেন্দ্রিক। দার্জিলিং শহর থেকে একটু নিচের দিকে নামলে বিশাল একটা বোটানিক্যাল গার্ডেন আছে। বোটানিক্যাল গার্ডেন এর পিছনের দিকের অংশে গোর্খা আদিবাসীদের একটা পাড়া আছে, সে পাড়াতেই তাদের বাড়ি। বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভিতর দিয়ে পাড়ায় যাওয়ার সরু একটা রাস্তা আছে।

মল রোড থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে সূর্যোদয় দেখার পর, সকালটা শুরু হতো বোটানিক্যাল গার্ডেনের নানা প্রকার পাখির কিচিরমিচির শব্দে। এখানে নানা প্রকার ফুলের সমারহ, নানা প্রকার গাছ দিয়ে পরিপূর্ণ। সবচেয়ে অবাক হয়েছি নানা প্রকারের অর্কিড ফুল দেখে, আর পাইন গাছের যে এতোগুলো জাত আছে সেটাও আগে জানতাম না, এখানে এসেই প্রথমবার জেনেছি। সকালে সবাই মিলে চলে যেতাম চা বাগানের দিকটায়, কিন্তু সন্ধ্যের আগেই ঠিকই চলে আসতাম শহরে।

দার্জিলিং শহর থেকে তাকালে যে চা বাগানটি দেখা যায় সেটির নাম হ্যাপি ভ্যালি চা বাগান। দার্জিলিং-এর সবচেয়ে পুরনো চা বাগানটি হল স্টেইনথাল চা বাগান। সেটি চালু হয়েছিল ১৮৫২ সালে, তার ঠিক দুই বছর পর চালু হয় হ্যাপি ভ্যালি চা বাগান।

এই চা বাগানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬,৯০০ ফুট উচ্চতায় ৪৪০ একর জমির উপর অবস্থিত। বাগানের চা গুল্মগুলির বয়স কমপক্ষে ৮০ বছর, কয়েকটি গুল্মের বয়স ১৫০ বছর। সাম্প্রতিক অতীতে খুব কম ক্ষেত্রেই পুনরায় গুল্ম রোপণ করা হয়েছে। দার্জিলিং শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে হিল কার্ট রোডের নিচে এই বাগানটি অবস্থিত, শহরের লকনগর রোড ও চকবাজার থেকে এখানে যাওয়া যায়।

সন্ধ্যে হলেই শহরে নানা ধরনের ভাজা পোড়া, মল রোড কিংবা দার্জিলিং-হিমালয়ান রেলস্টেশনে বসে, দার্জিলিং চা আর ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা, মাঝে মাঝে চলে যেতাম, ঘুম, কার্শিয়াং, সোনাডা কিংবা জলপাহারের দিকে। দার্জিলিং এর জলপাহাড়ের দিকটা অদ্ভুত রকমের সুন্দর। পাহাড়ের উপড়ে দাড়িয়ে থাকা মেঘে ঢাকা সেন্ট পল’স স্কুলটা, আহা।।

দার্জিলিং শহরেই এতো সুন্দর একটা সিনেমা হল আছে আমি জানতাম না। গোর্খা বন্ধুদের কল্যানেই প্রথম সেই সিনেমা হলে যাওয়া। সন্ধ্যের ঠিক আগে আগেই পুরো শহরের আলোগুলো একে একে জ্বেলে উঠতো, মেঘ এসে থমকে যেতো অদ্ভুত সুন্দর এই শহরের রাস্তাঘাট অলিগলি। আঁকাবাকা উঁচুনিচু পাহাড়ের উপর পিচঢালা পথ ধরে হেটে হেটে চলে যেতাম সিনেমা দেখতে। কত বিচিত্র সব দিন, কত শত স্মৃতি জমে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে, মেঘের সমুদ্রে ডুবে থাকা, পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ইট পাথরের এই শহরটায়।। মাঝে মাঝে ভাবি, আর দশটা ট্যুরিস্টদের মত আমিও যদি অন্যকোনো পেশাজীবি হতাম। তাহলে কি এতো স্মৃতি তৈরি হতো? হতো বোধহয়, হয়তো সেটা হতো অন্যভাবে, হয়তো অন্যরকম।


দার্জিলিং ছেড়ে আসার ঠিক দুদিন আগে নেপাল থেকে দেখা করার জন্য চলে এলো দুজন নেপালি বন্ধু। জাতিতে তারা একই- গোর্খা, কিন্তু একই জাতি আর ঘন্টা চারেকের রাস্তা হলেও মানচিত্রের সীমানার হিসেব অনুযায়ী আলাদা দেশ । নেপালী বন্ধু ধাকাল খুব করে ধরেছে ওর সাথে যেনো নেপাল ঘুরে তারপর দেশে আসি। তাকে অনেক কস্টে বোঝানো হলো, আমি ইন্ডিয়ান নই, ওর এখানে ঢুকতে যে বাধা নেই, আমার সেই বাধা আছে। ওকে কথা দিয়েছিলাম দেশে ফিরে কয়েকমাসের মধ্যেই ওর বাড়িতে যাবো, বানিজ্যিক ট্যুরের ব্যস্ততায় তখন আর হয়ে উঠে নি।

দার্জিলিং ভ্রমণ করেছে কিংবা করে নি অনেকের কাছে শুনেছি, দার্জিলিং এ দেখার তেমন কিছু নেই। ইউটিউবিং কিংবা ছবি দেখে, কে কার চেয়ে কম খরচে যেতে পারে সেই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে  দার্জিলিং এর কিছু স্পট ঘুরে আসা যাবে।  কিন্তু দার্জিলিং এর ভিতরের সৌন্দর্যকে স্পর্শ করতে হলে ভিতরকে জানার আগ্রহ ও ইচ্ছে থাকতে হবে। আমরা এরপর দার্জিলিং এ যতগুলো ট্যুর করিয়েছি, নিশ্চই স্পটের বাইরেও কিছু ভিন্নতা ছিলো।  আমি সবসময় একটা কথাই বলি, শুধুমাত্র ১২-১৪ টা ট্যুরিস্ট স্পটের শহর দার্জিলিং নয়, যেগুলো গাড়িতে চড়ে দু- একদিনেই দেখে শেষ করা যাবে কিন্তু আসলে দার্জিলিং কে দেখা হবে না। দার্জিলিং কে দেখতে হলে দেখার মত চোখ থাকতে হবে, অনুভব করার মত মন থাকতে হবে, আর অবশ্যই হাতে সময় থাকতে হবে। একমাসেও দার্জিলিং দেখে আর অনুভব করে শেষ করা যাবে না, দার্জিলিং এমনই একটি ভূ স্বর্গ । সবকিছু ক্যামেরার বন্দি করা যায় না, শুধু প্রকৃতির ফুলের আর শহরের কিছু ছবি এখানে দেয়া আছে, কিন্তু যে সৌন্দর্যের ছবি তোলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়, সেই গভীর সৌন্দর্যকে অনুভব করতে হলে যেতে হবে, নিম্ন হিমালয়ের মহাভারত শৈলশ্রেণীতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭,১০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে অপূর্ব শহর, দার্জিলিং।

সুখের সংজ্ঞা কি আমি জানি না, যারা জীবন নিয়ে খুব বেশি ভাবেন তারা হয়তো এর সংজ্ঞা বলতে পারবেন হয়তো। আমি হয়তো এতো কিছু ভাবি না, আমি জানি শুধু করোনার কারনে সবকিছু এখনো থমকে আছে।  আর ক্ষতি বলতে এটাই, ঘরে বসে বসে বয়সটা বাড়ছে, সময় চলে যাচ্ছে, পৃথিবীর অনেক পথ পেরুনো এখনো বাকি।।

সুমন্স ট্যুরিজম মানে অবশ্যই ভিন্ন কিছু, দেশ বা দেশের বাইরে যেকোনো জায়গা ভ্রমন করতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন +8801877027277 এই নাম্বারে। আমাদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ট্যুর প্যাকেজ থেকেও বিস্তারিত জানতে পারেন । যোগ দিতে পারেন আমাদের সুমন্স ট্যুরিজমের ফেসবুক গ্রুপে ঃhttps://www.facebook.com/groups/sumonstourism
দার্জিলিং ট্যুর প্যাকেজঃ https://www.sumonstourism.com/travel-item/darjiling-package/

লেখাঃ রেজাউল করিম সুমন
এডমিন, সুমন্স ট্যুরিজম

Leave a Reply