বান্দরবানের গহীনের দেবশিশু

Socialworks | Dec 20 | 2020 | No Comment

একটি শিশু, নাম জানি না, গোত্র জানি না, ধর্ম জানি না, শুধু জানি একজন মানুষ, দেবদূতদের মত একটি বাচ্চা মেয়ে শিশু। পায়ের হাটুর নিচের অংশ কাজ করে না, হাটুর উপর ভর দিয়ে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে নিচের ঝিরি থেকে পাহাড়ের উপর উঠছে। সেদিন সারাদিন ট্রেকিং এ আমার নিজের পায়ে যতগুলো পাথর বা কাটা বিধেছে, সবগুলো ব্যাথা এই বাচ্চা মেয়েটির হাটুর শক্তি দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করেছিলাম, সেদিন ছবি তুলতে গিয়ে চোখে পানি এসেছিলো, ঝাপসা দেখছিলাম সবকিছু। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, টিম সামনে এগিয়ে গেছে, আমাকেও সামনে এগুতে হবে, সব ছেড়ে চোখ মুছে সামনে এগিয়েছি।

২০১৩-১৪ দিকের ঘটনা এটি, তখনকার তোলা একটি ছবি, এই ছবিটি ই মনের কোনে ভেসেছে পাচটি বছর। পাহাড়ের অনেক জায়গায় ছুটেছি এই কয় বছরে, পাহাড়ে শত শত পাড়া গিয়েছি , কিন্তু এই বাচ্চাটির কাছে যাওয়া হয়ে উঠে নি বা খুজে পাই নি। ২০১৯ সালের শেষের দিকে আমাদের সুমন্স ট্যুরিজমের একটি ট্যুরের জন্য এসে , সেই পুরোনো তলা ছবি দিয়ে, খোজ লাগিয়ে অবশেষে সেই বাচ্চাটিকে, বাচ্চাটির পাড়া ও পিতামাতাকে খুজে পেয়েছি। সেই স্নিগ্ধ হাসিটি এখানো অমলিন। কি অদ্ভুত একটা প্রশান্তি, যার সাথে এই পৃথিবীর কোনোকিছুর তুলনা হয় না।

আমরা সিদ্ধান্ত নেই সেই ট্যুর থেকে প্রাপ্ত অর্থ আমরা বাচ্চাটির সাহায্যে দিয়ে যাবো। আমাদের সুমন্স ট্যুরিজম থেকে আয়ের বেশ বড় একটা অংশ দিয়ে আমরা বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে থাকি। বাচ্চাটির জন্য হয়তো খুব বেশি কিছু করতে পারি নি, কিন্তু এই সাহায্যের চেয়ে বড় যে জিনিসটির প্রয়োজন, সেটার নাম প্রেরনা৷  চাইলেই আমরা সকল সমস্যার সমাধান করতে পারি না, শিশুটির পা ঠিক হবে না হয়তো কিন্তু  সাহায্যের চেয়ে বড় যে জিনিসটা দিতে পারি  তার নাম প্রেরনা, বিশ্বাস, আস্থা, সাহস । শুধুমাত্র প্রেরনার জোরেই মানুষ পৃথিবী জয় করতে পারে৷

বাচ্চাটির নাম নাংক্রাপ্রু মারমা, পিতার নাম বাশৈ মারমা। ছবির মত সুন্দর একটা গ্রাম পেনেডং পাড়ায় বসবাস। এইতো কয়েকমাস আগেও এই পাড়ার সামন দিয়েই গিয়েছি, অথচ আমি তাকে খুজে পাই নি, বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম পাড়াটির কথা। পায়ের কারনে পড়াশোনা করা হয় নি, বাংলা জানে না। তবুও কি অদ্ভুত একটা কমিউনিকেশন। কেন জানি মনে হয়, সে আমার ভাষা বুঝতে না পারলেও, আমার সব কথা বুঝতে পেরেছে। এই খোজটা আগে পেলে হয়তো বাচ্চাটিকে পড়াশোনা করানো যেতো।।

একটা হুইল চেয়ার দেয়া যেতো, তার পরিবারের সাথে কথা হয়েছে, কিন্তু এটা তো সমতল নয়। প্রকৃতি হুইল চেয়ারে তাকে বসতে দিবে না। হয়তো শিশুটি ভাবে, যদি অন্য শিশুদের মত হাটতে পারতাম?? দৌড়াতে পারতাম, সবার সাথে খেলতে পারতাম?? সবার মত স্কুলে যেতে পারতাম??
মাঝে মাঝে মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা এতো নির্দয় কেন?? এই শিশুটি কেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে না, আর দশটা শিশুর মত??

কোনো একসময় চিন্তা করতাম, পাহাড় যেহেতু ভালবাসি, জীবনে কোনো একদিন এভারেস্ট জয় করার চেষ্টা করবো। এই শিশুর স্নিগ্ধ হাসিমুখ দেখার পর মনে হয়, আমরা সুমন্স ট্যুরিজম পাহাড়ের ভিতরে অনেকগুলো এভারেস্ট জয় করে ফেলেছি। প্রতিটি মানুষের মাঝেই একটি করে মাউন্ট এভারেস্ট বসবাস করে। আমাদের কাছে এই হাসিগুলোর মূল্য আমা্দের সপ্নের এভারেস্ট জয়ের চেয়ে অনেক বড় কিছু ।
আর সেই জয়ের অংশীদার আমাদের সুমন্স ট্যুরিজমের সকল ট্যুরিস্টরাই,যারা আমাদের সাথে ট্যুর করেন। সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থই খরচ করা হয় এইসব সামাজিক কর্মকান্ডে।  আমরা  পাশে আছি মা, যতদিন বেচে আছি। আগামীতে কতটুকু করতে পারবো  জানি না, কিন্তু নিজেদের  সীমাবদ্ধতার মাঝেও আমরা সবসময়  চেষ্টা তো করবোই, আর যেটা সবসময়  পারবো দিতে, সেটার নাম প্রেরনা, আস্থা, বিশ্বাস ও সাহস । তোমাকে খুজে পাওয়ার এই দিনটির মত আনন্দ, জীবনে খুব কমই অনুভব করেছি।। এ এক অন্যরকম আনন্দ, এই আনন্দ এভারেস্ট বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি আনন্দের।।
ভ্রমণই জীবন, জীবনই আনন্দ, আনন্দই জীবন।। জগতের সর্বপ্রানী সুখী হোক।।

সুমন্স ট্যুরিজম মানে অবশ্যই ভিন্ন কিছু, দেশ বা দেশের বাইরে যেকোনো জায়গা ভ্রমন করতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন +8801877027277 এই নাম্বারে।
আমাদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ট্যুর প্যাকেজ থেকেও বিস্তারিত জানতে পারেন । যোগ দিতে পারেন আমাদের সুমন্স ট্যুরিজমের ফেসবুক গ্রুপে ঃhttps://www.facebook.com/groups/sumonstourism
চাইলে আমাদের সাথে ট্যুর করে কিংবা সরাসরিও যেকোনো সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করতে পারেন।

লেখা ও ছবিঃ রেজাউল করিম সুমন
এডমিনঃ সুমন্স ট্যুরিজম

Leave a Reply